বিয়ে মানুষের জীবনে শুধু একজন জীবনসঙ্গী পাওয়ার মাধ্যম নয়; বরং এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে একটি পরিবার ও সুন্দর সামাজিক বন্ধন। কোরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বৈধভাবে জীবনসঙ্গী লাভ, চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা এবং সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে বংশধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিয়ের মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক শিক্ষার চর্চাও হয়। কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিয়ের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উপকারিতা তুলে ধরা হলো।
১. দ্বীন ও ইমানের পূর্ণতা
বিয়ের মাধ্যমে মুমিনের দ্বীন ও ইমান পূর্ণতা পায়। এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বান্দা যখন বিবাহ করে তখন সে তার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করে নেয়। অতএব তাকে তার অবশিষ্ট অর্ধেক দ্বীনের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা উচিত। (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৫৪৮৬) এছাড়া, বিয়ের মাধ্যমে দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান হেফাজতের বিষয়টি তো সর্বজনবিদিত। বিষয়টি হাদিসেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। নবীজি সা. বলেছেন, যুবকদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ তা দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করতে বেশি সহায়ক। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৬৯৩)
২. নবীজির সুন্নত পালন
বিয়ে সকল নবী-রাসুলের অন্যতম সুন্নত। আমাদের নবীজি সা. নিজে বিয়ে করেছেন এবং সাহাবিদেরও বিয়ের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। বিশেষ করে সামর্থ্যবান যুবকদের বিয়ের নির্দেশ দিয়ে তিনি এর গুরুত্ব স্পষ্ট করেছেন। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, যে যুবক বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তার বিয়ে করা উচিত। অতএব, বিয়েকে শুধু সামাজিক রীতি হিসেবে না দেখে সুন্নাহসম্মত জীবনব্যবস্থার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
৩. গুনাহ ও শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা
মানুষের স্বাভাবিকভাবেই জৈবিক চাহিদা থাকেই। এ চাহিদা আল্লাহপ্রদত্ত। এই চাহিদা পূরণার্থে মানুষ যেন পাপের পথে না-হাঁটে, তজ্জন্য আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির শুরু থেকে বিয়ে প্রথা দিয়ে মানবজাতিকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ বিয়ে দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করতে সহায়ক। আর যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, তাকে রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি)
৪. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা তৈরি
কোরআন দাম্পত্য সম্পর্ককে শুধু দায়িত্ব বা পারিবারিক চুক্তি হিসেবে দেখেনি; বরং এর মধ্যে ভালোবাসা ও মমতাকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ বলেন, তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। (সুরা আর-রুম, আয়াত :২১)
৫. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আত্মিক প্রশান্তির সম্পর্ক
বিয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দাম্পত্য জীবনে প্রশান্তি অর্জন। কোরআনের ভাষায়, আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন, যার মাধ্যমে তারা একে অপরের কাছে শান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পায়।
সুরা আর-রুমের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি মানুষের জন্য তাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করে। একই আয়াতে ভালোবাসা ও দয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে একটি আদর্শ দাম্পত্য সম্পর্ক শুধু একসঙ্গে বসবাসের বিষয় নয়; বরং তা মানসিক প্রশান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক দয়ার সম্পর্ক।
৬. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের ঢাল
কোরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বোঝাতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি উপমা এসেছে। আল্লাহ বলেন, তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত :১৮৭)
পোশাক যেমন মানুষকে আচ্ছাদিত ও সুরক্ষিত রাখে, তেমনি স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও আস্থার আশ্রয় হতে পারে। দাম্পত্য জীবনে একে অপরের দুর্বলতা গোপন রাখা, বিপদে পাশে থাকা এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
৭. রিজিকে বরকত লাভ
বিয়ে জীবনে রিজিক ও কল্যাণের দরজা খুলে দেওয়ার একটি মাধ্যম হতে পারে। কোরআনে আল্লাহ অবিবাহিতদের বিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, তারা দরিদ্র হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন।
আল্লাহ বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে দাও। তারা দরিদ্র হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (সুরা আন-নুর, আয়াত :৩২)
শুধু আর্থিক সংকটের আশঙ্কায় বৈধ বিয়েকে অসম্ভব মনে না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা এ আয়াতে পাওয়া যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিয়ের পর প্রত্যেক ব্যক্তির আর্থিক অবস্থা অবশ্যই একইভাবে বদলে যাবে; বরং রিজিক ও কল্যাণ আল্লাহর হাতে, এ বিশ্বাস রাখা ইসলামের শিক্ষা।
৮. বংশপরম্পরা রক্ষায় বৈধ সন্তান
বিয়ের মাধ্যমে বৈধ পরিবার ও সন্তান-সন্ততির ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। কোরআনে আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর মাধ্যমে সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মের কথা উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ বলেন, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জীবনসঙ্গীদের মাধ্যমে তোমাদের জন্য সন্তান ও নাতি-নাতনি সৃষ্টি করেছেন। (সুরা আন-নাহল, আয়াত:৭২)
সন্তান শুধু বংশধারা অব্যাহত রাখে না; সঠিক ইসলামি শিক্ষা ও নৈতিকতার মাধ্যমে তারা সমাজে কল্যাণের ধারাও এগিয়ে নিতে পারে।
৯. নেককার স্ত্রী জান্নাতে যাওয়ার পথ সহজ করে
ইসলামে নেককার জীবনসঙ্গীর গুরুত্ব অনেক বেশি। মহানবী (সা.) বলেছেন, দুনিয়ার সামগ্রীর মধ্যে নেককার স্ত্রী সর্বোত্তম সম্পদ। (সহিহ মুসলিম)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, কোনো নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমজানের রোজা রাখে, নিজের সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর বৈধ অধিকার আদায় করে, তাকে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে বলা হবে। (মিশকাতুল মাসাবিহ)
এ থেকে বোঝা যায়, নেককার জীবনসঙ্গী একজন মানুষের দুনিয়ার জীবনকে যেমন সুন্দর করতে পারেন, তেমনি আল্লাহর আনুগত্যে সহযোগীও হতে পারেন।
১০. নেককার সন্তান পরকালেও উপকারে আসে
সন্তান যদি নেককার ও আল্লাহভীরু হয়ে বেড়ে ওঠে, তাহলে তার দোয়া বাবা-মায়ের জন্য মৃত্যুর পরও উপকারের কারণ হতে পারে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকে—সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেককার সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম)
নিজস্ব প্রতিবেদক 














