বাংলাদেশ ০৫:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বৈরাচারের ফেরার পথ খুলে দেওয়া হবে শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি: প্রধানমন্ত্রী

বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত করা হলে তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ও আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল অবশ্যই সরকারের সমালোচনা করবে, তবে তা হতে হবে গঠনমূলক। শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করার পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে সংসদে আলোচনা, যুক্তিতর্ক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ও বিরোধী দল—উভয়েরই দেশের মানুষের কল্যাণে দায়িত্ব রয়েছে। সরকারি দলই শুধু জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে কিংবা বিরোধী দলই কেবল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকারসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদে আলোচনা ও যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জুলাই ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মিল রয়েছে। তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে।
শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষ যেন মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পায়, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং সবাই নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারে—এ লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব
ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রকৃতি ও বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণ করতে হবে। হাসপাতাল, সরকারি আবাসিক এলাকা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নাগরিকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যান জনগণ ও রাষ্ট্রের সম্পদ উল্লেখ করে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে নাগরিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

৮৩৪ শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভে
অনুষ্ঠানের আগে সকাল ১০টায় ওসমানী উদ্যানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেন তিনি। উদ্বোধনের পর স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারাও রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত ৯০ ফুট উঁচু স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক। স্মৃতিস্তম্ভের ভাস্কর্যে ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানে নতুন জলাশয় ও হাঁটার পথ রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। সংরক্ষণ করা হয়েছে বিদ্যমান গাছপালা; পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে।

উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা ও জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

ট্যাগ :

স্বৈরাচারের ফেরার পথ খুলে দেওয়া হবে শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: ০৫:০৬:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত করা হলে তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ও আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল অবশ্যই সরকারের সমালোচনা করবে, তবে তা হতে হবে গঠনমূলক। শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করার পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে সংসদে আলোচনা, যুক্তিতর্ক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ও বিরোধী দল—উভয়েরই দেশের মানুষের কল্যাণে দায়িত্ব রয়েছে। সরকারি দলই শুধু জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে কিংবা বিরোধী দলই কেবল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকারসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদে আলোচনা ও যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জুলাই ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মিল রয়েছে। তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে।
শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষ যেন মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পায়, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং সবাই নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারে—এ লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব
ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রকৃতি ও বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণ করতে হবে। হাসপাতাল, সরকারি আবাসিক এলাকা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নাগরিকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যান জনগণ ও রাষ্ট্রের সম্পদ উল্লেখ করে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে নাগরিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

৮৩৪ শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভে
অনুষ্ঠানের আগে সকাল ১০টায় ওসমানী উদ্যানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেন তিনি। উদ্বোধনের পর স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারাও রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত ৯০ ফুট উঁচু স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক। স্মৃতিস্তম্ভের ভাস্কর্যে ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানে নতুন জলাশয় ও হাঁটার পথ রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। সংরক্ষণ করা হয়েছে বিদ্যমান গাছপালা; পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে।

উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা ও জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।