দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নিয়ে চার দিনের সরকারি সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এ সফরে প্রধানমন্ত্রী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটিতে অবস্থান করবেন। সফরে দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের পাশাপাশি জাপানের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।
সফরে ঢাকার মেট্রোরেলসহ চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় ও জাপানের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর নিয়ে আলোচনা হবে।
১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্যাকেজ
বাংলাদেশের বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২৬-৩১ মেয়াদে জাপানের সঙ্গে ১২টি অগ্রাধিকার খাতে ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজের প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত প্যাকেজে পরিবহন ও নগর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়ীসহ সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার এবং উৎপাদন ও ইলেকট্রনিকস খাতে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া জ্বালানি ও সবুজ রূপান্তরে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নে ৯৪০ মিলিয়ন ডলার এবং কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্লু ইকোনমি, পর্যটন ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য খাতে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।
দুই প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠক
সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির মধ্যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলন এবং মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
বৈঠকে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
জাপানি কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক
সফরের তৃতীয় দিন ২৮ অক্টোবর জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিন তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি।
এ ছাড়া মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেরা-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হবে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশে শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনা গুরুত্ব পাবে।
এদিন টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান পরিবহন, সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হবে।
এসব বিষয়ে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি স্বাক্ষরিত হতে পারে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতেও পৃথক সমঝোতা স্মারক বিনিময়ের কর্মসূচি রয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সফরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং বিনিয়োগের
প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়েও আলোচনা হবে।
অবকাঠামো ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জেরার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। এ ছাড়া ইচিকাওয়া শহরে নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।
সফরের শেষ দিন ২৯ অক্টোবর টোকিও থেকে শিনকানসেন বা বুলেট ট্রেনে নাগোয়া যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মটোমাচি কারখানা এবং টয়োটা কমেমোরেটিভ মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি পরিদর্শন করবেন তিনি।
পরে টোকিও ফিরে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা।
স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে দেশটি সহযোগিতা দিয়ে আসছে।
এ সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি, অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় হ্রাস এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিষয়ে অগ্রগতি হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার হতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 











