বাংলাদেশ ০৭:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষাক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন চার বই

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন চারটি পাঠ্যবই যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। শিক্ষার্থীদের মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনার বাইরে এনে আনন্দময়, জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করাই এসব বই প্রণয়নের লক্ষ্য।

নতুন বইগুলো হলো চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি এবং বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বাড়ানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বইগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন চারটি পাঠ্যবই শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এর অংশ হিসেবে শিক্ষা খাতেও প্রয়োজনীয় সংস্কারে মনোনিবেশ করা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন। শিক্ষা নিয়ে তাঁর চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণার প্রতিফলন হিসেবেই পাঠ্যক্রমে নতুন বইগুলো যুক্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গত ১৫ বছর এ বিষয়ে কাজ করে তিনি বুঝেছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি তৈরি হোক—এমনটাই চান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে চান তিনি।

মাহ্দী আমিন জানান, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এনসিটিবিকে সম্পৃক্ত করা হয়। এ লক্ষ্যে এনসিটিবি একটি দল গঠন করে। এতে শিক্ষা খাতের নীতিমালা প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বরেণ্য শিক্ষাবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাঁদের মধ্যে ধারাবাহিক পরামর্শ ও সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয়ে পাঠ্যপুস্তকগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে। চারটি বইয়ের প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ কপি মুদ্রণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরই বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য ছাপাখানায় পাঠানো হবে।

এনসিটিবি জানায়, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। এরপর বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়েছে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, নতুন চারটি বই মুদ্রণের সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এনসিসির চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বইয়ের মুদ্রণকাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

খেলাধুলা: সুস্থ জীবনধারা ও আত্মরক্ষার কৌশল

এনসিটিবি জানায়, শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো বইটির মূল উদ্দেশ্য হলো, শিশুদের শৈশব থেকেই সুস্থ জীবনধারা ও ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলা।

বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়মকানুন সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষামূলক কৌশলও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া খেলার মাঠে কিংবা দৌড়ানোর সময় পড়ে গিয়ে কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া ও হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে কী করণীয়, তা বাস্তবসম্মত ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা জরুরি প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার এবং আঘাত প্রতিরোধের কৌশল হাতে-কলমে শিখতে পারবে। খেলাধুলার পাশাপাশি বইটিতে পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশছোঁয়া’ শিরোনামে একটি বাস্তবমুখী অনুপ্রেরণামূলক গল্প যুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়মান স্যার ও তাঁর সহকর্মী সাদিয়া আপার উদ্যোগে মেয়েদের ফুটবল দল গঠনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার পেরিয়ে মেহজাবিনসহ একাধিক শিক্ষার্থীর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হওয়ার গল্পের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, খেলাধুলা শুধু শরীর সুস্থ রাখে না; এটি পেশা হিসেবেও আর্থসামাজিক পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে একমুখী ও ক্লান্তিকর না হয়ে ওঠে, সেদিকে বিশেষ নজর রেখে প্রথমবারের মতো ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের পরিচয়

দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় ঘটাতে ১১টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি। এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা বর্ণিল চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটিতে বাংলা বর্ণমালার চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠাপুলির সংস্কৃতির পাশাপাশি পারিবারিক জীবনেও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। বাবা-মায়ের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গৃহস্থালির কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার আধুনিক রূপও এতে তুলে ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া একটি বিশেষ অধ্যায়ে শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি যুক্ত করা হয়েছে।

লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস: ভীতিমুক্ত ও আনন্দময় শিক্ষা

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি। পড়াশোনাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করে তোলার ধারণা থেকে বইটি তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এটি একটি নতুন সংযোজন হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে আনন্দময় অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সহপাঠক্রমিক বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কীভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভার অনেকাংশে কমবে বলে আশা করছে এনসিটিবি।

বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার আলোকে আনন্দঘন উপায়ে শিখনফল অর্জনের সুযোগ পাবে। এতে বোঝানো হবে, শেখা শুধু মুখস্থ করা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকেও জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং পড়াশোনাকে আরও সহজ ও আনন্দদায়ক করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

আমার কারিগরি শিক্ষা: হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জন

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার অভ্যাস এবং সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে তুলতে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য আটটি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি।

শিক্ষার্থীদের শুধু ‘আমি কী জানি’—এই তাত্ত্বিক ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘আমি কী করতে পারি’—সে বিষয়ে দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে তোলাই বইটির মূল লক্ষ্য।

বইটিতে কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, ছোট উদ্যোগের বড় সম্ভাবনা, যারা গড়ে তারাই বদলায়, সবুজ প্রযুক্তি এবং টেকসই জীবনযাপনসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বাস্তব জীবনের নানা কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রযুক্তির সহায়ক ব্যবহারের মাধ্যমে সেগুলোর মৌলিক সমাধান খুঁজে বের করার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। নতুন চারটি বইয়েই শব্দকোষের মতো বিশেষ অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে।

উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, চতুর্থ শ্রেণি থেকে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয় দুটি চালু করে পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও কারিগরি শিক্ষা বিষয় দুটি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণির পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হবে।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শওকত আলী খান বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তক চালুর ফলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।

ট্যাগ :

শিক্ষাক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন চার বই

প্রকাশিত: ০৫:৫৬:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন চারটি পাঠ্যবই যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। শিক্ষার্থীদের মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনার বাইরে এনে আনন্দময়, জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করাই এসব বই প্রণয়নের লক্ষ্য।

নতুন বইগুলো হলো চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি এবং বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বাড়ানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বইগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন চারটি পাঠ্যবই শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এর অংশ হিসেবে শিক্ষা খাতেও প্রয়োজনীয় সংস্কারে মনোনিবেশ করা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন। শিক্ষা নিয়ে তাঁর চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণার প্রতিফলন হিসেবেই পাঠ্যক্রমে নতুন বইগুলো যুক্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গত ১৫ বছর এ বিষয়ে কাজ করে তিনি বুঝেছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি তৈরি হোক—এমনটাই চান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে চান তিনি।

মাহ্দী আমিন জানান, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এনসিটিবিকে সম্পৃক্ত করা হয়। এ লক্ষ্যে এনসিটিবি একটি দল গঠন করে। এতে শিক্ষা খাতের নীতিমালা প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বরেণ্য শিক্ষাবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাঁদের মধ্যে ধারাবাহিক পরামর্শ ও সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয়ে পাঠ্যপুস্তকগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে। চারটি বইয়ের প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ কপি মুদ্রণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরই বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য ছাপাখানায় পাঠানো হবে।

এনসিটিবি জানায়, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। এরপর বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়েছে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, নতুন চারটি বই মুদ্রণের সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এনসিসির চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বইয়ের মুদ্রণকাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

খেলাধুলা: সুস্থ জীবনধারা ও আত্মরক্ষার কৌশল

এনসিটিবি জানায়, শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো বইটির মূল উদ্দেশ্য হলো, শিশুদের শৈশব থেকেই সুস্থ জীবনধারা ও ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলা।

বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়মকানুন সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষামূলক কৌশলও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া খেলার মাঠে কিংবা দৌড়ানোর সময় পড়ে গিয়ে কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া ও হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে কী করণীয়, তা বাস্তবসম্মত ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা জরুরি প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার এবং আঘাত প্রতিরোধের কৌশল হাতে-কলমে শিখতে পারবে। খেলাধুলার পাশাপাশি বইটিতে পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশছোঁয়া’ শিরোনামে একটি বাস্তবমুখী অনুপ্রেরণামূলক গল্প যুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়মান স্যার ও তাঁর সহকর্মী সাদিয়া আপার উদ্যোগে মেয়েদের ফুটবল দল গঠনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার পেরিয়ে মেহজাবিনসহ একাধিক শিক্ষার্থীর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হওয়ার গল্পের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, খেলাধুলা শুধু শরীর সুস্থ রাখে না; এটি পেশা হিসেবেও আর্থসামাজিক পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে একমুখী ও ক্লান্তিকর না হয়ে ওঠে, সেদিকে বিশেষ নজর রেখে প্রথমবারের মতো ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের পরিচয়

দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় ঘটাতে ১১টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি। এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা বর্ণিল চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটিতে বাংলা বর্ণমালার চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠাপুলির সংস্কৃতির পাশাপাশি পারিবারিক জীবনেও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। বাবা-মায়ের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গৃহস্থালির কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার আধুনিক রূপও এতে তুলে ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া একটি বিশেষ অধ্যায়ে শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি যুক্ত করা হয়েছে।

লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস: ভীতিমুক্ত ও আনন্দময় শিক্ষা

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি। পড়াশোনাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করে তোলার ধারণা থেকে বইটি তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এটি একটি নতুন সংযোজন হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে আনন্দময় অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সহপাঠক্রমিক বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কীভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভার অনেকাংশে কমবে বলে আশা করছে এনসিটিবি।

বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার আলোকে আনন্দঘন উপায়ে শিখনফল অর্জনের সুযোগ পাবে। এতে বোঝানো হবে, শেখা শুধু মুখস্থ করা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকেও জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং পড়াশোনাকে আরও সহজ ও আনন্দদায়ক করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

আমার কারিগরি শিক্ষা: হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জন

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার অভ্যাস এবং সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে তুলতে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য আটটি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি।

শিক্ষার্থীদের শুধু ‘আমি কী জানি’—এই তাত্ত্বিক ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘আমি কী করতে পারি’—সে বিষয়ে দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে তোলাই বইটির মূল লক্ষ্য।

বইটিতে কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, ছোট উদ্যোগের বড় সম্ভাবনা, যারা গড়ে তারাই বদলায়, সবুজ প্রযুক্তি এবং টেকসই জীবনযাপনসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বাস্তব জীবনের নানা কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রযুক্তির সহায়ক ব্যবহারের মাধ্যমে সেগুলোর মৌলিক সমাধান খুঁজে বের করার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। নতুন চারটি বইয়েই শব্দকোষের মতো বিশেষ অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে।

উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, চতুর্থ শ্রেণি থেকে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয় দুটি চালু করে পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও কারিগরি শিক্ষা বিষয় দুটি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণির পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হবে।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শওকত আলী খান বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তক চালুর ফলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।