টেস্ট ক্রিকেটে ধৈর্য, মনোযোগ আর আত্মবিশ্বাসের পরীক্ষা যেন নতুন করে দিলেন বাংলাদেশের ওপেনার সাদমান ইসলাম। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিন শেষে ৯৯ রানে অপরাজিত রয়েছেন তিনি। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র এক রান দূরে থাকা এই বাঁহাতি ব্যাটারের অপেক্ষা দীর্ঘ করেছে আলোকস্বল্পতা। বুধবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ২১৩ রান।
সাদমানের সামনে এখন ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করার সুযোগ। তবে এই অপেক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে মুশফিকুর রহিমের স্মৃতিও। গত বছরের নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে নিজের শততম টেস্টের প্রথম দিন শেষে ৯৯ রানে অপরাজিত ছিলেন মুশফিক। পরদিন সকালে সেঞ্চুরি পূর্ণ করে ঐতিহাসিক ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রাখেন বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞ ব্যাটার। এবার একই রকম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সাদমান। তিনিও কি পারবেন অপেক্ষার প্রহর শেষে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে?
এদিন নিজের স্বভাবসুলভ ধীরস্থির ব্যাটিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের মোকাবিলা করেন সাদমান। ২১৯ বলের ইনিংসটি সাজিয়েছেন ১০টি চারে। উইকেটের আচরণ ছিল ব্যাটারদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। অসম বাউন্স ও স্পিনের কারণে রান তোলা সহজ ছিল না। কিন্তু ধৈর্য ও শৃঙ্খলার সমন্বয়ে এক প্রান্ত আগলে রাখেন তিনি। প্রায় আট বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে এই প্রথম কোনো ইনিংসে দুই শতাধিক বল মোকাবিলা করলেন এই ওপেনার।
শুরুতেই চাপে বাংলাদেশ
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা ভালো করতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রথম সেশনেই বাজে শটে উইকেট হারান আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। এরপর থিতু হয়েও উইকেট বিলিয়ে দেন অভিজ্ঞ ব্যাটার মুমিনুল হক। ফলে শুরুতেই চাপে পড়ে স্বাগতিকরা।
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও বেশিক্ষণ ক্রিজে থাকতে পারেননি। তাঁর বিদায়ের পর দলের হাল ধরেন সাদমান ও তাওহিদ হৃদয়। দুজনের ব্যাটিংয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে ৯৫ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন সাদমান। অন্য প্রান্তে হৃদয়ও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলকে এগিয়ে নিতে থাকেন।
মুশফিকুর রহিমের চোটের কারণে একাদশে সুযোগ পাওয়া হৃদয় খেলছিলেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। সাদমানের সঙ্গে তাঁর জুটিতে বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত ৪২ রানে থাকতে বিপত্তি ঘটে। ৮২ বল মোকাবিলা করে তিনটি চার মারা এই ব্যাটারের পায়ের পেশিতে টান লাগায় তাঁকে স্ট্রেচারে করে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর বিদায়ে কিছুটা হলেও ধাক্কা খায় বাংলাদেশের ইনিংস।
এরপর উইকেটরক্ষক-ব্যাটার লিটন দাসকে নিয়ে দিনের বাকি সময়টা সামলে নেন সাদমান। আর কোনো উইকেট না হারিয়ে দিন শেষ করে বাংলাদেশ। তবে সেঞ্চুরি থেকে এক রান দূরে থেকে দিন শেষ করায় সাদমানের ব্যক্তিগত অর্জনের অপেক্ষা থেকেই যায়।
সেঞ্চুরির অপেক্ষায় সাদমান
দিনের শেষ ভাগে সাদমানের সামনে সেঞ্চুরি পূর্ণ করার সুযোগ তৈরি হলেও প্রকৃতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম দফায় আলোকস্বল্পতার কারণে খেলা বন্ধ হওয়ার সময় তিনি ৯৬ রানে অপরাজিত ছিলেন। পরে পরিস্থিতির উন্নতি হলে প্রায় ৫২ মিনিট পর আবার খেলা শুরু হয়। সেঞ্চুরি থেকে তখন মাত্র চার রান দূরে ছিলেন তিনি।
কিন্তু মাঠে ফেরার পর আর মাত্র তিন রান যোগ করতেই আবারও আলোকস্বল্পতার কারণে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। সাদমান তখন ৯৯ রানে অপরাজিত। আম্পায়াররা দিনের খেলা শেষ ঘোষণা করায় আর সেঞ্চুরি পূর্ণ করা হয়নি তাঁর।
গত বছরের এপ্রিলে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন সাদমান। এরপর ১৭ ইনিংস পেরিয়ে আবারও শতকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ইনিংসে ৫০ থেকে ৬০ রান করলেও সেগুলোকে বড় সংগ্রহে রূপ দিতে পারেননি এই ওপেনার। এবার দীর্ঘ ইনিংস খেলার মাধ্যমে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।

সাদমানের ওপর আস্থা ব্যাটিং কোচের
দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে আসেন ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। সাদমানের ব্যাটিংয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি আশা জানান, এই ওপেনার ইনিংসটি আরও বড় করবেন।
সালাউদ্দিন বলেন, অনেক দিন পর সাদমানের কাছ থেকে এমন দীর্ঘ ইনিংস দেখছেন তিনি। সাম্প্রতিক কয়েকটি ইনিংসে সাদমান ৫০-৬০ রান করলেও সেগুলো বড় করতে পারেননি। এবার সেই জায়গায় উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছেন কোচ। তাঁর আশা, সাদমান এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে ইনিংসটি আরও দীর্ঘ করবেন।
চোটের কারণে এই টেস্টে খেলতে না পারলেও দলের সঙ্গে রয়েছেন মুশফিকুর রহিম। সাধারণত একাদশের বাইরে থাকা খেলোয়াড়দের বিশ্রামে থাকার কথা থাকলেও সতীর্থদের জন্য পানি টানাসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছেন অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটার। নিজের শততম টেস্টে ৯৯ রানে অপরাজিত থাকার পর যেভাবে পরদিন সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছিলেন, সাদমানের জন্যও সেই অভিজ্ঞতা হতে পারে অনুপ্রেরণার উৎস।
সব মিলিয়ে প্রথম দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের অবস্থান মন্দ নয়। তিন উইকেট হারিয়ে ২১৩ রান তুলেছে দলটি। এক প্রান্তে অবিচল থাকা সাদমানের ব্যাটে বড় সংগ্রহের আশা দেখছে বাংলাদেশ। এখন অপেক্ষা বৃহস্পতিবার সকালের। দীর্ঘ রাতের চাপ সামলে ব্যাট হাতে নেমে সাদমান কি পারবেন কাঙ্ক্ষিত সেই একটি রান সংগ্রহ করে সেঞ্চুরি পূর্ণ করতে? নাকি আরও একবার ৯৯ রানের আক্ষেপ নিয়ে ফিরতে হবে তাঁকে? সেই উত্তর মিলবে দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই।
নিজস্ব প্রতিবেদক 











